সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

জাতীয় নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর করতে করনীয়

 জাতীয় নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধান দ্বারা সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১-এ বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৬৫ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হবে, যা জনগণের ভোটাধিকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। একই সঙ্গে অনুচ্ছেদ ১২২-এ ১৮ বছর পূর্ণ ও আইনগতভাবে অযোগ্য নন, এমন প্রত্যেক নাগরিকের ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়া ও ভোট প্রদানের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব বিধানের সমন্বয়ে স্পষ্ট হয় যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ কেবল নাগরিক অধিকারই নয়, বরং সংবিধান স্বীকৃত গণতান্ত্রিক দায়িত্ব। কিন্ত আমরা জনগণ বিষয়টিকে কিভাবে দেখছি, পরিসংখ্যানে বলে বাংলাদেশে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কমই ছিল। ১২তম সংসদ নির্বাচনে সার্বিকভাবে প্রায় ৪০ % ভোটার ভোট প্রদান করেছেন, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে অন্যতম নিম্ন অংশগ্রহণের হার হিসেবে ধরা হয়েছে।  এমন কম অংশগ্রহণের পেছনে কয়েকটি মূল কারণ থাকতে পারে যেমন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণে আগ্রহ কম থাকা, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনিয়মিত বা নির্বাচনে অংশ না নেওয়া, নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক উৎসব হিসেবে অনুভব না হওয়া, জনসাধারণের জন্য ভোট দিতে সুবিধাজনক পরিবেশের অভাব, নিরাপত্তার আশংকা ইত্যাদি।

এই পরিস্থিতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও উৎসাহমুখর করার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত প্রবল, কারণ সংসদীয় গণতন্ত্রে জনগণের ভোটের অংশগ্রহণই সবচেয়ে শক্তিশালী, যে দেশের নাগরিকরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণে অংশ নিচ্ছেন। অধিক অংশগ্রহণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর অধিক প্রতিনিধিত্ব, জনগণের আস্থা বৃদ্ধি, এবং সমাজে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি দৃঢ় করা নিশ্চিত করে। তাই আসন্ন নির্বাচনকে (জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে) উৎসবমুখর, অংশগ্রহণ ও সকল শ্রেণির মানুষের জন্য সহজলভ্য করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলে ভোটার উপস্থিতিও স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে এবং তা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে শক্তিশালী করবে।

অংশগ্রহণমূলক ও উৎসাহমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংক্ষেপে যা করা প্রয়োজন;

নির্বাচন উৎসব বোনাস: প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচনকালীন বছরে ‘নির্বাচন উৎসব বোনাস’ চালু করা যেতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা চাকরি, ব্যবসা বা অন্যান্য পেশার কারণে নিজ এলাকার বাইরে অবস্থান করেন, তাঁদের যাতায়াত ও সময়ের চাপ কমাতে এটি সহায়ক হবে। অনেকটা বাংলা নতুন বছরের উৎসব ভাতার মত।

ভোটবান্ধব সরকারি ছুটি: নির্বাচনের আগে ও পরে পর্যাপ্ত সরকারি ছুটি বহাল রাখা, যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে নিজ এলাকায় গিয়ে ভোট দিতে পারেবাংলা নববর্ষের ছুটির মতো একটি জাতীয় অনুভূতি তৈরি হবে।

নির্বাচনকে জাতীয় উৎসবে রূপ দেওয়া: নির্বাচনকে শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়, বরং নাগরিক দায়িত্ব ও গণতান্ত্রিক উৎসব হিসেবে উপস্থাপন করা।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রণোদনা: বোনাস ও ছুটির মাধ্যমে ভোটদানে ইতিবাচক প্রণোদনা তৈরি হলে ভোটার উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।

বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি: নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদার ভূমিকা ও সবার জন্য সমান সুযোগ।

সহিংসতামুক্ত প্রচারণা: শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, অপপ্রচার ও ভয়ভীতি রোধ।

ভোটার সচেতনতা: ভোটের গুরুত্ব, পদ্ধতি ও সময়সূচি নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম।

সব দলের অংশগ্রহণ: নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের সমান প্রচার সুযোগ নিশ্চিত করা।

তরুণ ও নারীদের সম্পৃক্ততা: বিশেষ উদ্যোগ, সহজ ভোটার নিবন্ধন ও ভোটকেন্দ্রে সহায়ক ব্যবস্থা।

স্বচ্ছ ভোটগ্রহণ: আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যবেক্ষক ও দ্রুত ফল প্রকাশ।

প্রবাসী ভোটের ব্যবস্থা: প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নে কার্যকর পদ্ধতি।

রাজনৈতিক দলের প্রচারণা: রাজনৈতিক দলগুলো কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য, বিশেষ প্রচারণা ও ব্যবস্থা করা।

প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ জনগোষ্ঠীর মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগে বিশেষ ব্যবস্থা: জাতীয় নির্বাচনে প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ জনগোষ্ঠীর মানুষের ভোটাধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা এবং প্রান্তিক অঞ্চলের জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য। এ জন্য প্রবীণ ও শারীরিকভাবে অক্ষম ভোটারদের জন্য সহজ প্রবেশযোগ্য ভোটকেন্দ্র, র‍্যাম্প, হুইলচেয়ার সুবিধা, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভোট প্রদানের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তাকারী ব্যক্তির সহায়তা নিশ্চিত করা যেতে পারে। বিশেষ জনগোষ্ঠী, যেমন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগণের জন্য মাতৃভাষায় নির্দেশনা, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ি, চর, হাওর ও দুর্গম প্রান্তিক অঞ্চলের জন্য ভ্রাম্যমাণ ভোটকেন্দ্র, বাড়তি ভোটগ্রহণ সময়, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে এসব এলাকার জনগণ নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত হবে। এ ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা জাতীয় নির্বাচনকে আরও ন্যায্য, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল করে তুলবে।


এই ধরনের উদ্যোগ নির্বাচনকে আরও অংশগ্রহণমূলক, আনন্দমুখর ও জনগণকেন্দ্রিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৫

বায়ুর গুণমান পর্যবেক্ষণে রিমোট সেনসিং ডাটা ও জিআইএস এর ব্যবহার: চট্টগ্রাম জেলার উপর সমীক্ষা

 ভূমিকা

বর্তমান বিশ্বে দ্রুত নগরায়ন শিল্পায়নের ফলে বায়ু দূষণ একটি গুরুতর পরিবেশগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বায়ু দূষণ শুধু মানবস্বাস্থ্য নয়, বরং পরিবেশ জলবায়ুর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এখন রিমোট সেনসিং ডাটা ভূ-তথ্য ব্যবস্থা (GIS) ব্যবহার করে বায়ুর গুণমান পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে, যা পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

গবেষণার উদ্দেশ্য

এই গবেষণার উদ্দেশ্য হলো রিমোট সেনসিং ডাটা ব্যবহার করে চট্টগ্রাম জেলার বায়ুর গুণমান মূল্যায়ন করা এবং দূষণের স্থানিক বন্টন বিশ্লেষণ করা।

ব্যবহৃত উপাত্ত পদ্ধতি

গবেষণায় ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) Sentinel-5P স্যাটেলাইট ডাটা ব্যবহার করা হয়েছে। এই ডাটাসেটের মাধ্যমে বায়ুতে উপস্থিত প্রধান দূষক গ্যাস যেমনNitrogen Dioxide (NO₂), Sulphur Dioxide (SO₂), Carbon Monoxide (CO), Ozone (O₃) এবং Methane (CH₄) এর ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। GIS সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডাটা প্রক্রিয়াজাত করে দূষণ ঘনত্বের মানচিত্র (concentration map) তৈরি করা হয়, যা স্থানিক বিশ্লেষণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এই গবেষণায় স্যাটেলাইট ডাটা বিশ্লেষণে গুগল আর্থ ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে, GIS সফটওয়্যার হিসেবে QGIS ব্যবহার করা হয়েছে।

ফলাফল ও বিশ্লেষণ

বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী নদীর উভয় তীরে দূষণমাত্রা সর্বাধিক। বিশেষ করে NO, SO, CO, O, CH গ্যাসের ঘনত্ব অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি। এর প্রধান কারণ হলো—

  • নদীর দুই তীরে অবস্থিত শিল্প ও বন্দর কার্যক্রম
  • যানবাহনের অতিরিক্ত ধোঁয়া
  • জ্বালানি দহন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা



দূষক

গড়

সর্বনিম্ন

সর্বোচ্চ

ইউনিট

NO2

0.000082866249

0.000065471010

0.000147387586

mol/m²

CO

0.040605023899

0.039097371307

0.042212521519

mol/m²

SO2

0.000098951528

-0.000001938400

0.000233547999

mol/m²

O3

0.121208951909

0.120944346991

0.121497209628

mol/m²

CH4

1932.011633627

1909.113017178

1960.349978183

ppb


দূষক গ্যাসগুলোর প্রভাব

দূষক গ্যাস

স্বাস্থ্যের প্রভাব

পরিবেশগত প্রভাব

NO

শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ, হাঁপানি বৃদ্ধি

অ্যাসিড বৃষ্টি সৃষ্টি করে

SO

চোখ ও গলায় জ্বালা, ফুসফুস ক্ষতি

উদ্ভিদের ক্ষতি, এসিড বৃষ্টি

CO

রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি, মাথাব্যথা

পরিবেশে গ্যাসীয় দূষণ বৃদ্ধি

O

ফুসফুসের কোষ ক্ষতি

কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব

CH

জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে

গ্রিনহাউস প্রভাব বৃদ্ধি করে


করণীয় ও সুপারিশ

বায়ু দূষণ হ্রাসে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন—

  • শিল্প কারখানায় আধুনিক ফিল্টার ও স্ক্রাবার প্রযুক্তি ব্যবহার।
  • পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রচলন।
  • সবুজ বেষ্টনী ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন।
  • নিয়মিত বায়ু গুণমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন।
  • জনগণকে সচেতনতা বৃদ্ধি ও পরিবেশবান্ধব আচরণে উৎসাহিত করা।
নগর পরিকল্পনায় গুরুত্ব

নগর পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বায়ু দূষণ তথ্য ও স্থানিক বিশ্লেষণকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা উচিত।

  • উচ্চ দূষণপ্রবণ এলাকায় নতুন শিল্প স্থাপন সীমিত করা।
  • নগর এলাকায় পর্যাপ্ত খোলা স্থান ও সবুজ অঞ্চল সংরক্ষণ।
  • পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবান্ধব টেকসই নগর নীতি প্রণয়ন।
  • GIS ভিত্তিক দূষণ মানচিত্র নগর পরিকল্পনার ডাটাবেজে সংযুক্ত করা।

উপসংহার

Sentinel-5P স্যাটেলাইট ডাটা GIS বিশ্লেষণ ব্যবহার করে বায়ু দূষণের স্থানিক ধরন চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে উচ্চমাত্রার দূষণ ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি নির্ভর দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে টেকসই নগরায়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৫

নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পেশাগত আঘাত এবং দুর্ঘটনা’র ঝুঁকি ও প্রতিরোধে আমাদের করণীয়

নিরাপদ কর্মপরিবেশ শ্রমিকদের মৌলিক অধিকারগুলির মধ্যে একটি। পেশাগত সুরক্ষা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ কাজের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শ্রমিকরা যেখানে কাজ করবে তা সকল ধরণের বিপদ এবং ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবে। অনুমান করা হয় যে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৬ কোটি মানুষ পেশাগত রোগে আক্রান্ত এবং প্রতি বছর দুই মিলিয়নেরও বেশি শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মারা যায় । এই ধরনের দুর্ঘটনা এবং অসুস্থতার কারণে শ্রমিক এবং তাদের পরিবার বিভিন্ন ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। আইএলও অনুমান করেছে যে পেশাগত রোগ এবং দুর্ঘটনার ফলে বিশ্বের বার্ষিক জিডিপির ৪ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়াও, নিয়োগকর্তারা দক্ষ কর্মী হারান, অসুস্থতথার কারণে অনুপস্থিতি এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার কারণে উৎপাদন ব্যহ্রত হয়।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে, বাংলাদেশের বাণিজ্য ও শিল্পে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হচ্ছে; এবং একই সাথে, শিল্পে (পোশাক খাত, নির্মাণ, উৎপাদন এবং কৃষি সহ শিল্প ও কারখানাগুলিতেও) শ্রমিকের সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির পরিমাণ  প্রায় ৭১.৪৪ মিলিয়ন (৭ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজার) জন। বাংলাদেশের শ্রমশক্তির বৃহত্তম অংশ কৃষি (প্রায় ৪০.৬%) এবং সেবা (প্রায় ৩৯.৬%) খাতে নিয়োজিত। শিল্প খাতে কর্মরতদের সংখ্যা প্রায় ২০.৪%। এর মধ্যে ৪৫ লক্ষ শ্রমিক বস্ত্র ও পোশাক খাতে কাজ করে, ১৫ লক্ষ শ্রমিক কাজ করেন প্লাস্টিক রিসাইক্লিং খাতে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিপুল সংখ্যক শ্রমিক পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে। দুর্বল পেশাগত সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক তাদের মূল্যবান জীবন হারায় এবং আহত হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ লেবার স্টাডিজ (বিআইএলএস) সংবাদপত্র ভিত্তিক জরিপ অনুসারে, গত দশ বছরে বিভিন্ন পেশাগত দুর্ঘটনায় মোট ৫৯০৯ জন শ্রমিক মারা গেছেন এবং ১৪৪১৩ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। ইপসা’র একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং শিল্পের সাথে জড়িত শ্রমিকদের জীবন আয়ু ৪৫-৫৫ বছর, যেখানে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের গড় আয়ু ৭০-৭২ বছর।

পরিসংখ্যানে দেখা যায় কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে। গত একদশকে শিল্পে প্রায় ১০ টি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেখানে প্রায় অর্ধ হাজার খানেক মানুষের মৃত্যু হয় এবং সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। শিল্পে সংঘটিত অধিকাংশ দুর্ঘটনা হলো অগ্নিকাণ্ড। ৩ জুন, ২০১০ তারিখে পুরান ঢাকার নিমতলী নবাব কাটরায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, ২৪ নভেম্বর, ২০১২ তারিখে ঢাকার আশুলিয়ায় নিশ্চিন্তপুরে তাজরিন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড, ২৪ এপ্রিল, ২০১৩ তারিখে রানা প্লাজা ধস এবং ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তারিখে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড প্রায় ৭০ জন প্রাণ হারায়, ২৮ মার্চ, ২০১৯ তারিখে ঢাকার বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ড, ০১ মার্চ ২০২১ তারিখে ঢাকার বেইলি রোডে এক বহুতল ভবনে বিধ্বংসী অগ্নিকান্ডে কমপক্ষে ৪৩ জন নিহত হয়েছেন, ১৪ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে গার্মেন্টসের প্রিন্টিং কারখানা এবং কেমিক্যাল গোডাউনে আগুনে কমপক্ষে ১৬ জন নিহত হয়, ১৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (সিইপিজেড) আল হামিদ টেক্সটাইল নামে একটি কারখানায় আগুন লেগেছে। নয়তলা ভবনটিতে পাঁচ শতাধিক শ্রমিক কাজ করে, সিইপিজেড কর্তৃপক্ষ ও কারখানার মালিকপক্ষ জানিয়েছে সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, ক্ষয়-ক্ষতি, আহত ও মৃত্যুর সংখ্যা এখনো জানা যায়নি।সিইপিজেড কর্তৃপক্ষ ও কারখানার মালিকপক্ষ জানিয়েছে সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, ক্ষয়-ক্ষতি, আহত ও মৃত্যুর সংখ্যা এখনো জানা যায়নি।

আমাদের অজ্ঞতা এবং অসচেতনতাই মূলত এই ধরনের দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানির জন্য দায়ী। আমরা যদি একটু সচেতন থাকতাম তবে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। বাংলাদেশ পেশাগত স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষার মান উন্নত করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও কর্মীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের আইনী ভিত্তি সমূহঃ

কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য একটি OSH নীতির প্রয়োজনীয়তা এবং তাৎপর্য স্বীকার করে, সরকার ২০১৩ সালে জাতীয় OSH নীতি গ্রহণ করে। এই প্রেক্ষাপটে, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বিভাগ (DIFE) ২০১৬ সালে প্রথম জাতীয় OSH প্রোফাইল তৈরি করে এবং তারপর ২০১৯ সালে তা আপডেট করে।

২০১৩ সালে রানা প্লাজা মর্মান্তিক ধসের পর, পেশাগত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা (OSH) সম্পর্কিত বিষয়গুলি গুরুত্বদিয়ে সামনে আসে এবং শ্রম আইন (সংশোধন), ২০১৩ পাস হয়। সংশোধিত বিধানগুলোর মধ্যে রয়েছে: শিশুদের জন্য বিপজ্জনক কাজ সম্পর্কিত একটি নতুন ধারা যুক্ত করা (ধারা ৩৯); জরুরি প্রস্থান (ধারা ৬২); শ্রমিকদের জন্য গ্যাংওয়ে, সিঁড়ি ইত্যাদিতে প্রবেশাধিকার (ধারা ৭২); ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের বাধ্যতামূলক ব্যবহার (ধারা ৭৮ক); ঘটনার ক্ষেত্রে/দুর্ঘটনা ঘটলে কর্তৃপক্ষের অবহিতকরণ বিজ্ঞপ্তি (ধারা ৮০); ৫০০০ এরও বেশি কর্মী নিযুক্ত কোম্পানিগুলিতে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন বাধ্যবাধকতা (ধারা ৮৯); এবং একটি সুরক্ষা কমিটি গঠন সম্পর্কিত ধারা (ধারা ৯০ক) সংযুক্ত হয়

বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে, প্রত্যেক নাগরিক তার যোগ্যতা অনুসারে, কাজ অনুসারে, নীতির ভিত্তিতে তার কাজের জন্য উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও নিরাপত্তা পাবে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০ বলা হয়েছে, সমাজতন্ত্র এবং শোষণ থেকে মুক্তি; অনুচ্ছেদ ১৪ বলা হয়েছে, কৃষক ও শ্রমিকদের মুক্তি; অনুচ্ছেদ ১৮ বলা হয়েছে, জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা; অনুচ্ছেদ ১৯ বলা হয়েছে, সুযোগের সমতা এবং অনুচ্ছেদ ২০ বলা হয়েছে, কাজকে অধিকার, কর্তব্য এবং সম্মানের বিষয়; অনুচ্ছেদ ৩৪ বলা হয়েছে, জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধকরণ; অনুচ্ছেদ ৩৮ বলা হয়েছে, সংগঠনের স্বাধীনতা, অনুচ্ছেদ ৩৮ বলা হয়েছে, পেশার স্বাধীনতা। কিন্ত বাস্তবিক ও অন্যান্য কারণে একজন শ্রমিক তার সাংবিধানিক অধিকার হারাচ্ছে।

সকলের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য বিশ্বব্যাপী, নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে, ৫ নভেম্বর ২০১৩ তারিখে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন ও গৃহীত হয়। নীতিটি বাংলাদেশের সকল কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রযোজ্য, যার মধ্যে রয়েছে শিল্প, কারখানা, উদ্যোগ, ব্যবসায়িক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। নীতিটির লক্ষ্য হল শ্রমিকের অপমৃত্যু, আঘাত এবং পেশা-সম্পর্কিত রোগের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা। নীতিটি বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় ক্ষেত্রেই কর্মরত সকল নারী ও পুরুষের জন্য প্রযোজ্য।

কর্মপরিবেশ ও পেশাগত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিষয়ক অন্যান্য নীতিমালা ও আইন সমূহঃ

  • অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন (২০০৩)
  • জাতীয় ভবন কোড (২০০৬)
  • শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন (২০০৬)
  • জাহাজ ভাঙা ও জাহাজ পুনর্ব্যবহার বিধিমালা (২০১১)
  • জাতীয় শ্রম নীতি (২০১৩)
  • জাতীয় শিশু শ্রম নির্মূল নীতি, (২০১০)
  • গৃহকর্মী কল্যাণ নীতি (২০১৫)

নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও কর্মীর পেশাগত স্বাস্থ্য উন্নয়নে করনীয়ঃ

নিরপদ কর্মপরিবেশ, পেশাগত আঘাত এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন উৎপাদনকারী সংস্থা, নিয়োগকর্তা, কর্মচারী/শ্রমিক এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে যৌথভাবে কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি সনাক্তকরণ এবং প্রশমনের জন্য একসাথে কাজ করা উচিত। এখানে কিছু কৌশল এবং ব্যবস্থা উল্লেখ করা হল যা নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পেশাগত আঘাত এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে:

ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং ঝুঁকি সনাক্তকরণ: কর্মক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিপদ/ঝুঁকি চিহ্নিত করার জন্য নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন পরিচালনা করতে হবে। চিহ্নিত বিপদগুলি নথিভুক্ত করে এবং তীব্রতা এবং ঘটনার সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে সেগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধান খোঁজা।

নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষা: কর্মীদের নিরাপত্তা পদ্ধতি, নিরাপদ কাজের অনুশীলন এবং সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান। নতুন কর্মীদের যথাযথ নিরাপত্তার দিকনির্দেশনা নিশ্চিতকরণ এবং নিয়মিত রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ সেশন আয়োজন। পেশাগত স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা এবং সচেতনতার সংস্কৃতি প্রচার

কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়ন এবং চর্চা: চিহ্নিত বিপদগুলি চিহ্নিত করে এবং পেশাগত স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা বিধিমালা তৈরী করতে হবে। বিধিমালা মেনে চলার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং বাস্তবায়ন করুন।

ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামাদির ব্যবহার নিশ্চিতকরণ (PPE): কর্মক্ষেত্রে চিহ্নিত বিপদের উপর ভিত্তি করে কর্মীদের উপযুক্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাদি (হেলমেট, গ্লাভস, সুরক্ষা চশমা, কান সুরক্ষা, উচ্চ-দৃশ্যমান পোশাক, শব্দ সুরক্ষা যন্ত্র এবং শ্বাসযন্ত্রের সুরক্ষা সরঞ্জামাদি ইত্যাদি) সরবরাহ করুন। PPE-এর সঠিক ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংরক্ষণ সম্পর্কে কর্মীদের প্রশিক্ষণ আয়োজন। সুরক্ষা সরঞ্জামাদির প্রাপ্যতা এবং যথাযথ ফিটিং নিশ্চিত করতে হবে।

নিয়মিত কর্মক্ষেত্র পরিদর্শন এবং রক্ষণাবেক্ষণ: সম্ভাব্য বিপদ/ঝুঁকি বা ত্রুটি সনাক্ত করার জন্য সরঞ্জামাদি, যন্ত্রপাতি এবং কর্ম পরিবেশের নিয়মিত/বিধিমালা পরিদর্শন করুন। সমস্ত সরঞ্জামাদি সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে এবং ভাল কাজের অবস্থায় রয়েছে তা নিশ্চিত করার জন্য একটি মনিটরিং শিডিউল তৈরি করে, তারা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

কর্মদক্ষতা এবং ওয়ার্কস্টেশন নকশা: কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি কমাতে এবং পেশীবহুল ব্যাধির ঝুঁকি কমাতে ওয়ার্কস্টেশন ব্যবহার উপযোগী বা অপ্টিমাইজ করতে হবে। সঠিক আসন, কর্মদক্ষতা সরঞ্জাোদি এবং সামঞ্জস্যযোগ্য ওয়ার্কস্টেশন এবং কর্মীদের কাজের ভঙ্গির মতো বিষয়গুলি বিবেচনা করতে হবে।

রিপোটিং চ্যানেল স্থাপন এবং তদন্ত: পেশাগত আঘাত, দুর্ঘটনা, রিপোটিং করার জন্য একটি প্রবেশগম্য রিপোটিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবেযেমন, হট লাইন, ই-মেইল, অভিযোগ বাক্স, ফোকাল পারসন নিয়োগ ইত্যাদিকর্মীদের দ্রুত ঘটনা রিপোর্ট করতে উৎসাহিত করুন এবং মূল কারণগুলি সনাক্ত করার জন্য তদন্ত পরিচালনা করা নিশ্চিত করতে হবেতদন্তে ঘটনার কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দায়ীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসাঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে

নিরাপত্তা কমিটি গঠন এবং কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা: নিরাপত্তা কমিটিতে কর্মীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত ও উৎসাহিত করতে হবে। ঝুঁকি চিহ্নিত করতে, নিরাপত্তা উন্নতির পরামর্শ জানতে এবং নিরাপত্তা উদ্যোগে কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। এটি কর্মীদের মধ্যে মালিকানা এবং দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে।

ক্রমাগত উন্নতি: নিয়মিতভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নীতি এবং পদ্ধতির কার্যকারিতা পর্যালোচনা এবং মূল্যায়ন করতে হবে। উন্নতির ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করে এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপগুলি বাস্তবায়ন করতে হবে। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে পারে এমন শিল্পের সেরা অনুশীলন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সম্পর্কে আপডেট থাকতে হবে।

শ্রমিকদের সচেতনতা এবং ক্ষমতায়ন: শ্রমিকদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ উত্থাপনের জন্য তাদের ক্ষমতায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সরকারী সংস্থা এবং বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) শ্রমিকদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সংবেদনশীল করা এবং পেশাগত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা (OHS) সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান করা প্রয়োজন। শ্রসিকদের অধিকার রক্ষার জন্য নিরাপত্তা কমিটিতে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ এবং ট্রেড ইউনিয়ন গঠনও গুরুত্বপূর্ণ।

বিপজ্জনক পদার্থ: শিল্পে বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থের পরিচালনা এবং ব্যবস্থাপনার দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। পেশাগত ঝুঁকি কমাতে রাসায়নিক এবং অন্যান্য বিপজ্জনক পদার্থের ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ, সঠিক সংরক্ষণ এবং লেবেলিং অপরিহার্য।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: বাংলাদেশে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সংস্থা, উৎপাদনকারী সংস্থা, ব্র্যান্ড এবং অংশীদারদের ভূমিকা রয়েছে। শ্রমিকের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সর্বোত্তম অনুশীলন ভাগ করে নেওয়া শিল্পের নিরাপত্তা মান বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে।

সম্বনীত উদ্যোগ প্রয়োজন: বাংলাদেশে কার্যকর পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা অনুশীলন নিশ্চিত করার জন্য সরকার, নিয়োগকর্তা, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিরন্তর প্রচেষ্টা প্রয়োজন। দেশে নিরাপদ কর্মক্ষেত্র তৈরির জন্য আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, শ্রমিকদের ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি, নিরাপত্তা সংস্কৃতি প্রচার এবং অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ।

মনে রাখতে হবে, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পেশাগত আঘাত এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরে সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক মন-মানসিকতা ও সংস্কৃতির প্রয়োজন। নিরাপত্তার সংস্কৃতি প্রচার, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে, পরিবেশের উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ কর্ম-পরিবেশ, আঘাত, দুর্ঘটনার ঝুঁকি, সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতি ও মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। এবং ব্যবসায় উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব।




সোমবার, ২১ জুলাই, ২০২৫

একটি অপারেশন ও বিকল আইপিএস থেকে শিক্ষা

 কিছু অভিজ্ঞতা জীবনে এমন শিক্ষা দিয়ে যায়, যা বইয়ে পাওয়া যায় না। সম্প্রতি, আমার জীবনে এমনই দুটি ঘটনা ঘটে গেল যা আমাকে শিখিয়ে দিল কিভাবে বাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

কয়েকদিন আগে আমার স্ত্রী হঠাৎ তীব্র ব্যথা অনুভব করে। আমি ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই এবং দ্রুত তাকে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাই। চিকিৎসক আল্ট্রাসনোগ্রামসহ বেশ কিছু পরীক্ষা করান। টেষ্ট রিপো্ট দেখে ডাক্তার তড়িঘড়ি করে বলেন, "অপারেশন করতে হবে, দেরি করা যাবে না!" আমি থমকে যাই, এত বড় সিদ্ধান্ত! তখন আমি সময় চেয়ে নিই এবং সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলি। তাদের পরামর্শে আমি আরেকজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হই। সেই চিকিৎসক পরীক্ষা করে বলেন, “এটা কোনো বড় সমস্যা না, অপারেশন লাগবে না।” তার পরামর্শে প্রয়োজনীয় ওষুধে স্ত্রী এখন ভালো আছেন। ভাবতে গিয়েই গা শিউরে ওঠে, প্রথম চিকিৎসকের কথায় যদি অপারেশন করিয়ে ফেলতাম, কী ভয়ংকর অপূরনীয় ক্ষতি হয়ে যেতে পারত!

আরেকটা ঘটনা ঘটে গেল আজকে। হঠাৎ করে বাসার আইপিএসটি বিকল হয়ে যায়। পরিচিত এক টেকনিশিয়ানকে ডেকে আনলাম। সে দেখে বলল, "এইটা আর ঠিক হবে না, নতুন আইপিএস কিনতে হবে।" আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম, লোডশেডিং এই লাগামহীন সময়ে বাসায় বিদুৎ না থাকলে আমার ছোট ছোট মেয়েরা খুব কষ্ট পাবে, ভাবলাম যেভাবেই হোক টাকা ম্যানেজ করে নতুন আইপিবসে কিনতে হবে, আবার মনে মনে বিকল্প উপায় খুঁজলাম

কিন্তু তখনই মনে পড়ে গেল আমার স্ত্রীর চিকিৎসার ঘটনার কথা। ভাবলাম, আরেকজনের মতামত নেই দেখি। আমি যেখান থেকে আইপিএসটি কিনেছিলাম, সেখানে যাই। তারা বলল, ওয়ারেন্টি শেষ, কিন্তু সাহায্য করবে। একজন দক্ষ টেকনিশিয়ানকে পাঠাল। তিনি এসে ভালোভাবে পরীক্ষা করে ছোট একটা যান্ত্রিক ত্রুটি খুঁজে পান এবং মিনিট দশেকেই আইপিএসটি মেরামত করে দেন। এখন আবার আগের মতো আইপিএসটি কাজ করছে! টেকনিশিয়ান বলল, সমস্যা হলে জানাবেন ভাবতে পারেন নতুন মেশিন কেনা মানে যে বড় অর্থনৈতিক চাপ ছিল, তা আপাতত এড়ানো গেল।

এই দুটি ঘটনার পর আমি একটি মূল্যবান শিক্ষা পেয়েছি: একটি সমস্যার সমাধান খুঁজতে কখনো এককভাবে সিদ্ধান্তে না গিয়ে, সময় নিয়ে আরও কিছু মতামত সংগ্রহ পরিচিতদের কাছ থেকে মতামত সংগ্রহ করা উচিত। একাধিক মত থেকে যাচাই-বাছাই করে আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত এবং অভিজ্ঞতায় বলে সে সিদ্ধান্তের ফলাফল হবে বাস্তবসম্মত, সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ সত্যিই, জীবনের অনেক কঠিন মুহূর্তে ঠান্ডা মাথায় ভাবা আর বিকল্প খোঁজার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সঠিক পথের সন্ধান।

AI হোক আপনার চিন্তার সহযোগী কিন্ত আপনার চিন্তার বিকল্প নয়!

 সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ এবং কিছুটা উদ্বেগজনক তথ্য; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এর অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের স্মৃতিশক্তি, উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা এবং সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ ক্ষমতা হ্রাস করতে পারে। গবেষকরা চার মাস ধরে ৫৪ জন শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। দেখা যায়, যারা লেখার ক্ষেত্রে নিয়মিত AI-এর ওপর নির্ভর করছিলেন, তাদের মস্তিষ্কের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয়। এতে তাদের স্মৃতিশক্তি ও বিশ্লেষণী চিন্তার দক্ষতা হ্রাস পেয়েছে।

অন্যদিকে, যেসব শিক্ষার্থী প্রাথমিকভাবে AI ছাড়া গতানুগতিক পড়াশোনা শুরু করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ChatGPT-এর মতো AI ব্যবহার করে ধারণা সংগ্রহ করেছেন, তাদের মস্তিষ্ক আরও বেশি সক্রিয় নিয়মিত AI ব্যবহারকারী তুলনায়। এ থেকে বোঝা যায়, AI তখনই সবচেয়ে কার্যকর যখন এটি চিন্তার বিকল্প না হয়ে চিন্তাকে সমৃদ্ধ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

গবেষকরা আরও সতর্ক করেছেন যে, যখন ব্যবহারকারীরা যাচাই-বাছাই না করে অ্যালগরিদমিক উত্তর গ্রহণ করেন, তখন "ইকো চেম্বার" তৈরি হয়, যা চিন্তাধারার বৈচিত্র্য নষ্ট করে ফেলে। এই গবেষণা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়, AI হতে পারে এক মূল্যবান সহযোগী, তবে এটি যেন কখনো আমাদের নিজস্ব চিন্তাশক্তির বিকল্প না হয়ে ওঠে। তাই AI ব্যবহারে আমাদের হতে হবে পরোক্ষ অংশগ্রহণকারী, কেবল সক্রিয় ব্যবহারকারী নয়। নিজের বিশ্লেষণ, প্রশ্ন এবং চিন্তার ভিতের উপর দাঁড়িয়ে AI-কে ব্যবহার করলেই তা হয়ে উঠবে আমাদের প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়ক। আমরা AI কে নিয়ন্ত্রন করব, AI আমাদেরকে নয়!