রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তন: আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা

আজ ৫ জুন ২০২৬। বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ “জলবায়ু পরিবর্তন: আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা”। এই প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা আজ যে সিদ্ধান্ত নেব, যে জীবনধারা বেছে নেব, তার ওপরই নির্ভর করছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব। 

বিখ্যাত গবেষক ও চিন্তাবিদ রামিয়া মাজে (Ramia Mazé) তাঁর একটি তাত্ত্বিক প্রবন্ধে স্পষ্ট করে বলেছেন:

"ভবিষ্যৎ কোনো শূন্য বা খালি জায়গা নয়। আমাদের চারপাশের তৈরি পরিবেশ, অবকাঠামো এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা জিনিসপত্র দিয়েই ভবিষ্যৎ পূর্ণ বা occupied হবে। আমরা প্রতিদিন অভ্যাসবশত বা কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে যা কিছু ডিজাইন বা পরিকল্পনা করছি, তার দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল কিন্তু ভবিষ্যৎকে বহন করতে হবে।”

অর্থাৎ, ভবিষ্যৎ কোনো জাদুমন্ত্রে হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো বিষয় নয়। আজ আমরা যে পণ্যটি তৈরি করছি, যে বাড়িটি বানাচ্ছি, যে রাস্তাটি তৈরি করছি, কিংবা পরম আয়েশে যে এসি বা এআই (AI) প্রযুক্তি ব্যবহার করছি তা দিয়েই কিন্তু অলক্ষ্যে রচিত হচ্ছে আমাদের আগামী দিনের পরিবেশ।

১. আমাদের, ডিজাইন, নকশা, পরিকল্পনা, আমাদের ভুল ও পরিবেশের বর্তমান সংকট

ভবিষৎ এর আয়নায় যদি আমরা আমাদের বর্তমান কর্মকাণ্ডের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাবো আমাদের প্রাত্যহিক ‘লাইফস্টাইল ডিজাইন’ এবং নীতিগুলো পরিবেশের জন্য কতটা হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠছে। আমাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে গিয়ে আমরা এমন এক অবৈজ্ঞানিক ও ভোগবাদী জীবনযাত্রার নকশা তৈরি করেছি, যা প্রতিনিয়ত ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে;

জীবাশ্ম জ্বালানির অতিপ্রয়োগ: শিল্পকারখানা, আধুনিক পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমরা কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়াচ্ছি। এর ফলে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে, যা গ্রিনহাউস ইফেক্ট তৈরি করে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

নির্বিচারে বন উজাড় বা পাহাড় কর্তন: খাদ্যের যোগানের জন্য, কৃষিজমির সম্প্রসারণ, আসবাবপত্র তৈরি এবং জ্বালানির প্রয়োজনে মানুষ প্রতিনিয়ত গাছ কেটে বনভূমি উজাড় ও পাহাড় কর্তন করছে। বন ধ্বংসের ফলে বাতাসে কার্বনের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে, মাটির ক্ষয় বাড়ছে এবং বন্যপ্রাণীরা তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান হারিয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রামে পাহাড় কর্তন ও বনের গাছ কেটে ফেলার কারণে প্রায়ই সেখানে পাহাড় ধসের মতো মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটছে।

অপরিকল্পিত নগরায়ন ও জলাশয় ভরাট: নদী, নালা, খাল এবং নিচু জমি ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ করার যে আধুনিক নকশা আমরা তৈরি করেছি, তা প্রকৃতির স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের পথকে বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরগুলোতে দেখা দিচ্ছে তীব্র কৃত্রিম বন্যা ও জলাবদ্ধতা। স্থানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে (Heat Island Effect) ও ভূমিকা রাখছে।

নদী শাসন, বাঁধের ত্রুটিপূর্ণ নকশা (ডিজাইন) ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে বাধা: বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আশির দশকে তৈরি করা পোল্ডার (Polder) বা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলোর নকশায় দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত প্রভাবের কথা ভাবা হয়নি। ফলে নদীগুলোতে পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে এবং স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের তৈরি এই নকশা বা ইঞ্জিনিয়ারিং আজ জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় (যেমন: আইলা, আম্পান বা রিমালের মতো ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস) সহজেই ভেঙে পড়ছে এবং লাখ লাখ মানুষকে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত করছে। তাছাড়াও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য আমরা নদীতে বাঁধ/সেতু নির্মাণ ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে রাস্তা/রেল লাইন তৈরী ও অবকাঠামো নির্মাণ ও বন্যা ও জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী, যেমন: কিশোরগঞ্জের ইটনা–মিঠামইন–অষ্টগ্রাম সড়ক ও দোহাজারী–কক্সবাজার রেললাইন।

প্লাস্টিক দূষণ: আমাদের ভোগের জন্য পণ্য ও পণ্যের মোড়ক ‘ওয়ান-টাইম’ প্লাস্টিক হবার কারণে আজ পৃথিবীর মাটি ও পানিকে বিষাক্ত করে তুলেছে। পণ্যের উৎপাদন, মোড়ক ও বাজারজাতকরণে ডিজাইন ফর এনভায়রনমেন্ট নীতি অনুসরন করা হচ্ছে না। এই প্লাস্টিক বর্জ্য মাটি ও পানির উর্বরতা নষ্ট করছে। নদী ও সমুদ্রে গিয়ে এগুলো সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে এবং একপর্যায়ে 'মাইক্রোপ্লাস্টিক' হিসেবে আমাদের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে ক্যান্সারসহ নানা রোগের সৃষ্টি করছে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে কয়েক ফুট গভীর পলিথিনের স্তর জমে গেছে। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক স্রোত ও জলজ জীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত।এই প্লাস্টিক দূষণ আমাদের পরিবেশ ও ভবিষতেরর পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।

রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার: কৃষিজমিতে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে আমরা অতিরিক্ত মাত্রায় রাসায়নিক সার ও বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করছে। যার ফলে, বৃষ্টির পানির সাথে ধুয়ে এই রাসায়নিকগুলো আশপাশের জলাশয়ে মিশে পানির অক্সিজেন কমিয়ে দেয় (ইউট্রোফিকেশন), যার ফলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে। আমাদের দেশের বিভিন্ন হাওর ও বিলের (যেমন: চলনবিল) দেশীয় মাছের প্রজাতিগুলো আজ হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, যা পানির পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলেছে।

২. ব্যক্তিগত আচরণ 

আমাদের প্রত্যেকের ছোট ছোট দৈনিক সিদ্ধান্ত এবং অভ্যাসের সমষ্টিই দিনশেষে পরিবেশের বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোগবাদী মানসিকতা ও অপচয়; আধুনিক যুগের "ব্যবহার করো এবং ফেলে দাও" (Use and Throw) সংস্কৃতি পরিবেশের বড় ক্ষতি করছে। প্রয়োজন না থাকলেও অতিরিক্ত জামাকাপড়, ইলেকট্রনিক্স বা গ্যাজেট কেনা এবং সামান্য পুরনো হলেই তা ফেলে দেওয়া ই-বর্জ্য ও কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সম্পদের দায়িত্বহীন ব্যবহার; ঘরে কেউ না থাকলেও ফ্যান-এসি ছেড়ে রাখা, দাঁত মাজার সময় পানির কল ছেড়ে রাখা কিংবা অল্প দূরত্বের রাস্তায় হেঁটে না গিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করা; এই ছোট ছোট আচরণগুলো সামগ্রিকভাবে বিপুল পরিমাণ শক্তি ও জীবাশ্ম জ্বালানির অপচয় ঘটাচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অসচেতনতা; চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল বা পলিথিন ডাস্টবিনে না ফেলে যেখানে, সেখানে (যেমন: রাস্তায়, ড্রেনে বা নদীতে) ফেলে দেওয়া আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। 

৩. সামাজিকতা ও সংস্কৃতি 

সামাজিক রীতিনীতি, লোকদেখানো সংস্কৃতি এবং সামষ্টিক আচরণ পরিবেশের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। উৎসব ও আয়োজনে অপচয়ের সংস্কৃতি; বিয়ে, জন্মদিন বা ধর্মীয় উৎসবগুলোতে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা, সাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমে শব্দদূষণ এবং বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিকের ওয়ান-টাইম থালা-বাসন ব্যবহার করা এখন সামাজিক আভিজাত্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎসব শেষে এই টন টন প্লাস্টিক বর্জ্য প্রকৃতির ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে। সামাজিক মর্যাদার ভুল ধারণা; সমাজে পায়ে হাঁটা, সাইকেল চালানো বা গণপরিবহন (বাস/ট্রেন) ব্যবহার করার চেয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি (যেমন: SUV বা প্রাইভেট কার) ব্যবহার করাকে বেশি মর্যাদাপূর্ণ মনে করা হয়। এই সামাজিক মানসিকতার কারণে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা ও বায়ুদূষণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। খাদ্য অপচয়; সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত খাবার তৈরি এবং তা অপচয় করা একটি নিয়মিত ঘটনা। এই অপচয়কৃত খাবার যখন পচে, তখন তা থেকে ‘মিথেন’ নামক অত্যন্ত ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায়। যা আমাদের ভবিষৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

৪. রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আচরণ

পরিবেশ রক্ষায় বা ধ্বংসে সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী ভূমিকা রাখে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। অবিজ্ঞতা ও গবেষণায় দেখা যায়, কোনো দেশের নীতি বা উন্নয়ন পরিকল্পনা কখনোই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয় এবং এর স্থায়ী প্রভাব ভবিষ্যতের ওপর পড়ে। নীতি নির্ধারকরা অনেক সময় পরিবেশের চেয়ে অর্থনৈতিক লাভকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। অনেক সময় রাজনৈতিক দল বা সরকার ক্ষণস্থায়ী অর্থনৈতিক লাভ বা জিডিপি (GDP) বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত ক্ষতিকে উপেক্ষা করে। বড় বড় শিল্পকারখানা বা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেওয়া, পরিবেশগত প্রভাবের (Environmental Impact Assessment) সঠিক মূল্যায়ন করা হয় না। যেমন; সুন্দরবনের কাছাকাছি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন বা ত্রুটিপূর্ণ পোল্ডার (বাঁধ) নির্মাণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো বাংলাদেশের উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে স্থায়ী ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।

দুর্বল আইন ও দুর্নীতি: পরিবেশ রক্ষার জন্য কাগজে-কলমে কঠোর আইন থাকলেও, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং দুর্নীতির কারণে তার সঠিক বাস্তবায়ন হয় না। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নদী দখল করা, কৃষিজমিতে অবৈধ ইটভাটা গড়ে তোলা কিংবা বন কেটে আবাসন তৈরি করার পরও পার পেয়ে যাওয়া পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।

৫. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI এবং পরিবেশগত হুমকি

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন আমাদের জীবনকে সহজ করলেও, এর পরিবেশগত মূল্য আকাশচুম্বী। আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সামরিক শক্তির অপপ্রয়োগ পরিবেশের জন্য এক নতুন আপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

আমরা প্রতিদিন যে চ্যাটজিপিটি বা এআই এর মতো বড় বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ব্যবহার করছি, সেগুলোর ব্যাকএন্ডে সচল থাকা ডেটা সেন্টারগুলো, এগুলোকে ঠান্ডা রাখতে বিপুল পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটি-র মতো এআই-এর সাথে মাত্র ২০ থেকে ৫০টি সাধারণ কথোপকথন বা প্রম্পটের (Prompts) জন্য প্রায় ৫০০ মিলিলিটার (এক বোতল) পানি খরচ হয়। আর সম্পূর্ণ জিপিটি-৪ (GPT-4) মডেলটি ট্রেনিং বা তৈরি করার সময় কয়েক কোটি লিটার পানি বাষ্পীভূত হয়ে গেছে, যা দিয়ে বড় একটি শহরের মানুষের পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব।

একটি সাধারণ গুগল সার্চের চেয়ে একটি AI প্রম্পটের উত্তর তৈরি করতে প্রায় ১০ গুণ বেশি বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। ২০২৬ সালের মধ্যে শুধুমাত্র AI-এর পেছনে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হবে, তা আয়ারল্যান্ড বা নিউজিল্যান্ডের মতো একটি পুরো দেশের বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদার সমান। এই বিদ্যুৎ তৈরি করতে কয়লা বা গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো হচ্ছে, যা বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৬. ইলেকট্রনিক বর্জ্য

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে মানুষ প্রতিনিয়ত নতুন স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও গ্যাজেট কিনছে এবং পুরোনোগুলো ফেলে দিচ্ছে।

ই-বর্জ্যের স্তূপ: প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। উদাহরণ: এই বর্জ্যগুলোর ভেতরে সিসা (Lead), পারদ (Mercury) এবং ক্যাডমিয়ামের মতো মারাত্মক বিষাক্ত রাসায়নিক থাকে। এগুলো যখন মাটিতে বা ডাম্পিং স্টেশনে ফেলা হয়, তখন তা মাটির নিচে গিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির সাথে মিশে যায়।

ক্রিপ্টোকারেন্সি মাইনিং: বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সি মাইনিং করার জন্য যে জটিল গাণিতিক হিসাবনিকাশ করতে হয়, তার জন্য শক্তিশালী কম্পিউটারের প্রয়োজন। এর ফলে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ অপচয় হয়, তা অনেক উন্নত দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের চেয়েও বেশি, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করছে।

৭. যুদ্ধবিগ্রহ ও সামরিক প্রযুক্তির বিধ্বংসী রূপ

পরিবেশের সবচেয়ে বড় এবং তাৎক্ষণিক ক্ষতিটি করে আধুনিক যুদ্ধ এবং সামরিক শক্তির অপপ্রয়োগ।

তাত্ক্ষণিক কার্বন বোমা: একটি যুদ্ধ শুরু হলে সামরিক ট্যাংক, যুদ্ধবিমান এবং যুদ্ধজাহাজ সচল রাখতে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল পোড়ানো হয়, তা অবিশ্বাস্য। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বা মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোর কারণে প্রথম কয়েক মাসেই যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে মিশেছে, তা বিশ্বের বহু ছোট দেশের এক বছরের মোট কার্বন নিঃসরণের চেয়েও বেশি।

মাটি ও পানির দীর্ঘমেয়াদী বিষাক্তকরণ: আধুনিক বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র এবং গোলাবারুদে নানা ধরনের ভারী ধাতু ও রাসায়নিক (যেমন: হোয়াইট ফসফরাস বা ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম) ব্যবহার করা হয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার ব্যবহার করা রাসায়নিক ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ (Agent Orange)-এর কারণে সেখানকার বনাঞ্চল ও কৃষিজমি আজও উর্বরতা ফিরে পায়নি। একইভাবে আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষতিকর রাসায়নিকগুলো বৃষ্টির পানির সাথে মিশে নদী ও সমুদ্রের জলজ পরিবেশ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিচ্ছে। 

আগামীর নিরাপত্তার জন্য করণীয়: কিছু জরুরি পরামর্শ

ভবিষ্যৎ যেহেতু এখনো সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়নি, এটি সবসময়ই উন্মুক্ত এবং পরিবর্তনশীল, আমাদের চলমান কার্যক্রম ও ডিজাইন ভবিষৎকে নির্ধারন করছে। তাই, একে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করার সুযোগ আমাদের হাতেই রয়েছে। আমাদের পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা থেকে বাঁচতে হলে আমাদের 'রিডাইরেক্টিভ ডিজাইন' (Redirective Design) বা দিক-পরিবর্তনকারী পরিকল্পনার আশ্রয় নিতে হবে। আমাদের ডিজাইন ও পরিকল্পনার ধারা পরিবর্তন করে পরিবেশবান্ধব বা 'টেকসই ডিজাইন' (Sustainable Design)-এর দিকে যেতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না, তবে এর ‘ডিজাইন’ বা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই পরিবেশের কথা মাথায় রাখতে হবে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং শক্তির সীমিত ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস, নীতি এবং অবকাঠামোগত নকশা পরিবর্তন, আইনের সঠিক প্রয়োগ তবে পরিবেশকে এই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য পরিবেশসম্মত ও প্রকৃতি-বান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনাই এখন একমাত্র পথ।

তাই আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের ‘দিক-পরিবর্তনকারী পরিকল্পনা’ বা Redirective Design-এর দিকে যেতে হবে। আমাদের জন্য করণীয় পরামর্শগুলো নিচে দেওয়া হলো: 

ব্যক্তিগত স্তরে মিতব্যয়িতা: প্রাত্যহিক জীবনে প্লাস্টিক ও পলিথিন পণ্যকে ডিজাইন ফর এনভায়রনমেন্ট আওতায় আনতে হবে। অপ্রয়োজনে পানি, বিদ্যুৎ ও এসি-র ব্যবহার বন্ধ রাখুন। ডিজিটাল ডিভাইস ও এআই (AI) প্রযুক্তির ব্যবহারে দায়িত্বশীল হোন; অপ্রয়োজনীয় প্রম্পট বা ডেটা ক্লাউডে জমিয়ে রাখা পরিহার করুন।

সামাজিক সচেতনতা ও বর্জ্য পৃথকীকরণ: সামাজিক অনুষ্ঠানে একক ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করুন। ঘরোয়া ও সামাজিক বর্জ্য যেখানে-সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন এবং পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্লাস্টিক বর্জ্য সঠিক ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে সারকুর্লার অর্থনীতির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

প্রকৃতি-বান্ধব বা সবুজ নকশা (Green Design): নতুন ঘরবাড়ি বা অবকাঠামো নির্মাণের সময় এমন নকশা করুন যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে, যেন কৃত্রিম আলো বা এসির ওপর নির্ভরতা কমে আসে, ছাদগুলোতে ছাদ-কৃষি বা বৃক্ষরোপণ বাধ্যতামূলক করা উচিত।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর আইন: সরকারকে পরিবেশ রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। নদী-জলাশয় দখলমুক্ত করা, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা, কৃষি জমি ভরাট বন্ধ করা, বিল্ডিং প্লান সঠিক অনুমোদন, সব পণ্যের ডিজাইন ফর এনভায়রনমেন্ট নিশ্চিত করা, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তার ব্যবহ্রত পণ্যের (বর্জ্যের) ব্যবস্থাপনার দায়িত্ নেওয়া, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষাও গবেষণায় বরাদ্দ দেওয়া এবং পরিবেশ আইন অমান্যকারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশগত প্রভাবের (EIA) সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্ব নেতাদের দায়িত্ব ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা: জলবায়ু পরিবর্তন কোনো একক দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, তাই এর মোকাবিলায় বিশ্ব নেতাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও যৌথ পদক্ষেপ সবচেয়ে বেশি জরুরি। আমরা গবেষণায় ও লিটারেটার থেকে দেখেছি, বড় বড় নীতি বা পলিসিগুলো আমাদের ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক তেমনি উন্নত বিশ্বের নেতাদের অদূরদর্শী নীতি আজ পুরো পৃথিবীকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রথম সারিতে থাকা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে বাঁচাতে বিশ্ব নেতাদের প্রধান দায়িত্ব হলো কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি বা 'প্যারিস চুক্তি' (Paris Agreement) অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা। শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলোকে অনতিবিলম্বে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকতে হবে। একই সাথে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন ও নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত 'গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড' বা জলবায়ু তহবিল নিশ্চিত করা বিশ্ব নেতাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। প্রযুক্তি ও যুদ্ধের পেছনে বিপুল অর্থ ও শক্তি অপচয় না করে, সেই সম্পদ বৈশ্বিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং প্রকৃতি-বান্ধব টেকসই নকশা (Sustainable Design) বাস্তবায়নে বিনিয়োগ করতে হবে। বিশ্ব নেতাদের আজকের এই সম্মিলিত দূরদর্শী সিদ্ধান্তই কেবল পারে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের মানুষের আগামীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান: উপকূলীয় অঞ্চলে কৃত্রিম কংক্রিটের বাঁধের চেয়ে বেশি করে ম্যানগ্রোভ বা বনায়ন তৈরি করতে হবে, যা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক দেওয়াল হিসেবে কাজ করবে।

শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

Today’s Design is "Defuturing" Cumilla City

When we think of the future, we often treat it as an empty space, a blank canvas waiting for modern high-rises and "progress." But as contemporary design ethnography teaches us: The future is not empty. The future is already crowded. It is loaded with the physical consequences of the choices, policies, and designs we approve today. What we build today doesn't just disappear tomorrow; it stays to shape or destroy the livability of our world.

A Heartbreaking Reality Check from Cumilla City

During this Eid vacation, I visited my hometown, Cumilla City. Culturally ancient and economically vital, Cumilla is currently undergoing hyper-urbanization. But this growth comes with a devastating price tag: the systematic erasure of our history and public spaces. The most shocking example? Munsef Bari one of Cumilla’s most iconic, colonial-era heritage properties. With its beautiful courtyards and green, open vistas, it has been a vital historical anchor and environmental breathing space for generations. Today, a massive corporate signboard stands in front of it. Its demolition is imminent. It is set to be replaced by another concrete multi-storied building. Like Munsef Bari, countless heritage structures and open spaces across Cumilla are being wiped out to accommodate vertical density.

The Disconnect in Modern Urban Planning

As a researcher, this live experience exposes a dangerous gap in how our city authorities and urban planners operate. Right now, authorities grant building approvals by looking at isolated, two-dimensional blueprints. They focus on real estate speculation and short-term capital. In doing so, they completely ignore the future urban environment. By prioritizing concrete over climate, current environmental design practices are actively manufacturing severe crises:

  • The Urban Heat Island Effect: Replacing green areas and old brick structures with dense glass and concrete traps solar radiation, turning Cumilla into a suffocating heat zone.
  • Severe Waterlogging: Paving over canals, ponds, and open soil creates impervious surfaces. Even moderate monsoon rain now triggers toxic flooding because the water has nowhere to sink.
  • Loss of Resilience: We are losing the natural and social infrastructures that keep our communities connected and ecologically safe.

My Message to Planners, Authorities, and Society

We are not just "waiting" for a future; we are actively designing it right now. Our current interventions are making tomorrow incredibly vulnerable. We are responsible for our future. If our design practices do not become friendly to the future, a horrible, unliveable reality awaits the next generation.

We urgently need:

  1. Political Commitment: Strong legislative action to protect cultural landmarks like Munsef Bari from corporate real estate.
  2. Accountable Planning: Municipal approval processes must evaluate cumulative environmental and microclimatic impacts, not just structural margins.
  3. Societal Responsibility: As citizens, we must demand a say in how our cities are built.
Let’s stop treating the future as an empty site for exploitation. We must design with long-term accountability, because the concrete we pour today is the exact reality our children will be forced to survive in tomorrow.

সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

জাতীয় নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর করতে করনীয়

 জাতীয় নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধান দ্বারা সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১-এ বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৬৫ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হবে, যা জনগণের ভোটাধিকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। একই সঙ্গে অনুচ্ছেদ ১২২-এ ১৮ বছর পূর্ণ ও আইনগতভাবে অযোগ্য নন, এমন প্রত্যেক নাগরিকের ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়া ও ভোট প্রদানের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব বিধানের সমন্বয়ে স্পষ্ট হয় যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ কেবল নাগরিক অধিকারই নয়, বরং সংবিধান স্বীকৃত গণতান্ত্রিক দায়িত্ব। কিন্ত আমরা জনগণ বিষয়টিকে কিভাবে দেখছি, পরিসংখ্যানে বলে বাংলাদেশে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কমই ছিল। ১২তম সংসদ নির্বাচনে সার্বিকভাবে প্রায় ৪০ % ভোটার ভোট প্রদান করেছেন, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে অন্যতম নিম্ন অংশগ্রহণের হার হিসেবে ধরা হয়েছে।  এমন কম অংশগ্রহণের পেছনে কয়েকটি মূল কারণ থাকতে পারে যেমন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণে আগ্রহ কম থাকা, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনিয়মিত বা নির্বাচনে অংশ না নেওয়া, নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক উৎসব হিসেবে অনুভব না হওয়া, জনসাধারণের জন্য ভোট দিতে সুবিধাজনক পরিবেশের অভাব, নিরাপত্তার আশংকা ইত্যাদি।

এই পরিস্থিতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও উৎসাহমুখর করার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত প্রবল, কারণ সংসদীয় গণতন্ত্রে জনগণের ভোটের অংশগ্রহণই সবচেয়ে শক্তিশালী, যে দেশের নাগরিকরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণে অংশ নিচ্ছেন। অধিক অংশগ্রহণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর অধিক প্রতিনিধিত্ব, জনগণের আস্থা বৃদ্ধি, এবং সমাজে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি দৃঢ় করা নিশ্চিত করে। তাই আসন্ন নির্বাচনকে (জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে) উৎসবমুখর, অংশগ্রহণ ও সকল শ্রেণির মানুষের জন্য সহজলভ্য করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলে ভোটার উপস্থিতিও স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে এবং তা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে শক্তিশালী করবে।

অংশগ্রহণমূলক ও উৎসাহমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংক্ষেপে যা করা প্রয়োজন;

নির্বাচন উৎসব বোনাস: প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচনকালীন বছরে ‘নির্বাচন উৎসব বোনাস’ চালু করা যেতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা চাকরি, ব্যবসা বা অন্যান্য পেশার কারণে নিজ এলাকার বাইরে অবস্থান করেন, তাঁদের যাতায়াত ও সময়ের চাপ কমাতে এটি সহায়ক হবে। অনেকটা বাংলা নতুন বছরের উৎসব ভাতার মত।

ভোটবান্ধব সরকারি ছুটি: নির্বাচনের আগে ও পরে পর্যাপ্ত সরকারি ছুটি বহাল রাখা, যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে নিজ এলাকায় গিয়ে ভোট দিতে পারেবাংলা নববর্ষের ছুটির মতো একটি জাতীয় অনুভূতি তৈরি হবে।

নির্বাচনকে জাতীয় উৎসবে রূপ দেওয়া: নির্বাচনকে শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়, বরং নাগরিক দায়িত্ব ও গণতান্ত্রিক উৎসব হিসেবে উপস্থাপন করা।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রণোদনা: বোনাস ও ছুটির মাধ্যমে ভোটদানে ইতিবাচক প্রণোদনা তৈরি হলে ভোটার উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।

বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি: নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদার ভূমিকা ও সবার জন্য সমান সুযোগ।

সহিংসতামুক্ত প্রচারণা: শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, অপপ্রচার ও ভয়ভীতি রোধ।

ভোটার সচেতনতা: ভোটের গুরুত্ব, পদ্ধতি ও সময়সূচি নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম।

সব দলের অংশগ্রহণ: নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের সমান প্রচার সুযোগ নিশ্চিত করা।

তরুণ ও নারীদের সম্পৃক্ততা: বিশেষ উদ্যোগ, সহজ ভোটার নিবন্ধন ও ভোটকেন্দ্রে সহায়ক ব্যবস্থা।

স্বচ্ছ ভোটগ্রহণ: আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যবেক্ষক ও দ্রুত ফল প্রকাশ।

প্রবাসী ভোটের ব্যবস্থা: প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নে কার্যকর পদ্ধতি।

রাজনৈতিক দলের প্রচারণা: রাজনৈতিক দলগুলো কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য, বিশেষ প্রচারণা ও ব্যবস্থা করা।

প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ জনগোষ্ঠীর মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগে বিশেষ ব্যবস্থা: জাতীয় নির্বাচনে প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ জনগোষ্ঠীর মানুষের ভোটাধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা এবং প্রান্তিক অঞ্চলের জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য। এ জন্য প্রবীণ ও শারীরিকভাবে অক্ষম ভোটারদের জন্য সহজ প্রবেশযোগ্য ভোটকেন্দ্র, র‍্যাম্প, হুইলচেয়ার সুবিধা, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভোট প্রদানের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তাকারী ব্যক্তির সহায়তা নিশ্চিত করা যেতে পারে। বিশেষ জনগোষ্ঠী, যেমন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগণের জন্য মাতৃভাষায় নির্দেশনা, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ি, চর, হাওর ও দুর্গম প্রান্তিক অঞ্চলের জন্য ভ্রাম্যমাণ ভোটকেন্দ্র, বাড়তি ভোটগ্রহণ সময়, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে এসব এলাকার জনগণ নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত হবে। এ ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা জাতীয় নির্বাচনকে আরও ন্যায্য, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল করে তুলবে।


এই ধরনের উদ্যোগ নির্বাচনকে আরও অংশগ্রহণমূলক, আনন্দমুখর ও জনগণকেন্দ্রিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৫

বায়ুর গুণমান পর্যবেক্ষণে রিমোট সেনসিং ডাটা ও জিআইএস এর ব্যবহার: চট্টগ্রাম জেলার উপর সমীক্ষা

 ভূমিকা

বর্তমান বিশ্বে দ্রুত নগরায়ন শিল্পায়নের ফলে বায়ু দূষণ একটি গুরুতর পরিবেশগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বায়ু দূষণ শুধু মানবস্বাস্থ্য নয়, বরং পরিবেশ জলবায়ুর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এখন রিমোট সেনসিং ডাটা ভূ-তথ্য ব্যবস্থা (GIS) ব্যবহার করে বায়ুর গুণমান পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে, যা পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

গবেষণার উদ্দেশ্য

এই গবেষণার উদ্দেশ্য হলো রিমোট সেনসিং ডাটা ব্যবহার করে চট্টগ্রাম জেলার বায়ুর গুণমান মূল্যায়ন করা এবং দূষণের স্থানিক বন্টন বিশ্লেষণ করা।

ব্যবহৃত উপাত্ত পদ্ধতি

গবেষণায় ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) Sentinel-5P স্যাটেলাইট ডাটা ব্যবহার করা হয়েছে। এই ডাটাসেটের মাধ্যমে বায়ুতে উপস্থিত প্রধান দূষক গ্যাস যেমনNitrogen Dioxide (NO₂), Sulphur Dioxide (SO₂), Carbon Monoxide (CO), Ozone (O₃) এবং Methane (CH₄) এর ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। GIS সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডাটা প্রক্রিয়াজাত করে দূষণ ঘনত্বের মানচিত্র (concentration map) তৈরি করা হয়, যা স্থানিক বিশ্লেষণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এই গবেষণায় স্যাটেলাইট ডাটা বিশ্লেষণে গুগল আর্থ ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে, GIS সফটওয়্যার হিসেবে QGIS ব্যবহার করা হয়েছে।

ফলাফল ও বিশ্লেষণ

বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী নদীর উভয় তীরে দূষণমাত্রা সর্বাধিক। বিশেষ করে NO, SO, CO, O, CH গ্যাসের ঘনত্ব অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি। এর প্রধান কারণ হলো—

  • নদীর দুই তীরে অবস্থিত শিল্প ও বন্দর কার্যক্রম
  • যানবাহনের অতিরিক্ত ধোঁয়া
  • জ্বালানি দহন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা



দূষক

গড়

সর্বনিম্ন

সর্বোচ্চ

ইউনিট

NO2

0.000082866249

0.000065471010

0.000147387586

mol/m²

CO

0.040605023899

0.039097371307

0.042212521519

mol/m²

SO2

0.000098951528

-0.000001938400

0.000233547999

mol/m²

O3

0.121208951909

0.120944346991

0.121497209628

mol/m²

CH4

1932.011633627

1909.113017178

1960.349978183

ppb


দূষক গ্যাসগুলোর প্রভাব

দূষক গ্যাস

স্বাস্থ্যের প্রভাব

পরিবেশগত প্রভাব

NO

শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ, হাঁপানি বৃদ্ধি

অ্যাসিড বৃষ্টি সৃষ্টি করে

SO

চোখ ও গলায় জ্বালা, ফুসফুস ক্ষতি

উদ্ভিদের ক্ষতি, এসিড বৃষ্টি

CO

রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি, মাথাব্যথা

পরিবেশে গ্যাসীয় দূষণ বৃদ্ধি

O

ফুসফুসের কোষ ক্ষতি

কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব

CH

জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে

গ্রিনহাউস প্রভাব বৃদ্ধি করে


করণীয় ও সুপারিশ

বায়ু দূষণ হ্রাসে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন—

  • শিল্প কারখানায় আধুনিক ফিল্টার ও স্ক্রাবার প্রযুক্তি ব্যবহার।
  • পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রচলন।
  • সবুজ বেষ্টনী ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন।
  • নিয়মিত বায়ু গুণমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন।
  • জনগণকে সচেতনতা বৃদ্ধি ও পরিবেশবান্ধব আচরণে উৎসাহিত করা।
নগর পরিকল্পনায় গুরুত্ব

নগর পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বায়ু দূষণ তথ্য ও স্থানিক বিশ্লেষণকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা উচিত।

  • উচ্চ দূষণপ্রবণ এলাকায় নতুন শিল্প স্থাপন সীমিত করা।
  • নগর এলাকায় পর্যাপ্ত খোলা স্থান ও সবুজ অঞ্চল সংরক্ষণ।
  • পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবান্ধব টেকসই নগর নীতি প্রণয়ন।
  • GIS ভিত্তিক দূষণ মানচিত্র নগর পরিকল্পনার ডাটাবেজে সংযুক্ত করা।

উপসংহার

Sentinel-5P স্যাটেলাইট ডাটা GIS বিশ্লেষণ ব্যবহার করে বায়ু দূষণের স্থানিক ধরন চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে উচ্চমাত্রার দূষণ ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি নির্ভর দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে টেকসই নগরায়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।