সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

জাতীয় নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর করতে করনীয়

 জাতীয় নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধান দ্বারা সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১-এ বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৬৫ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হবে, যা জনগণের ভোটাধিকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। একই সঙ্গে অনুচ্ছেদ ১২২-এ ১৮ বছর পূর্ণ ও আইনগতভাবে অযোগ্য নন, এমন প্রত্যেক নাগরিকের ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়া ও ভোট প্রদানের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব বিধানের সমন্বয়ে স্পষ্ট হয় যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ কেবল নাগরিক অধিকারই নয়, বরং সংবিধান স্বীকৃত গণতান্ত্রিক দায়িত্ব। কিন্ত আমরা জনগণ বিষয়টিকে কিভাবে দেখছি, পরিসংখ্যানে বলে বাংলাদেশে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কমই ছিল। ১২তম সংসদ নির্বাচনে সার্বিকভাবে প্রায় ৪০ % ভোটার ভোট প্রদান করেছেন, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে অন্যতম নিম্ন অংশগ্রহণের হার হিসেবে ধরা হয়েছে।  এমন কম অংশগ্রহণের পেছনে কয়েকটি মূল কারণ থাকতে পারে যেমন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণে আগ্রহ কম থাকা, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনিয়মিত বা নির্বাচনে অংশ না নেওয়া, নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক উৎসব হিসেবে অনুভব না হওয়া, জনসাধারণের জন্য ভোট দিতে সুবিধাজনক পরিবেশের অভাব, নিরাপত্তার আশংকা ইত্যাদি।

এই পরিস্থিতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও উৎসাহমুখর করার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত প্রবল, কারণ সংসদীয় গণতন্ত্রে জনগণের ভোটের অংশগ্রহণই সবচেয়ে শক্তিশালী, যে দেশের নাগরিকরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণে অংশ নিচ্ছেন। অধিক অংশগ্রহণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর অধিক প্রতিনিধিত্ব, জনগণের আস্থা বৃদ্ধি, এবং সমাজে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি দৃঢ় করা নিশ্চিত করে। তাই আসন্ন নির্বাচনকে (জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে) উৎসবমুখর, অংশগ্রহণ ও সকল শ্রেণির মানুষের জন্য সহজলভ্য করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলে ভোটার উপস্থিতিও স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে এবং তা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে শক্তিশালী করবে।

অংশগ্রহণমূলক ও উৎসাহমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংক্ষেপে যা করা প্রয়োজন;

নির্বাচন উৎসব বোনাস: প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচনকালীন বছরে ‘নির্বাচন উৎসব বোনাস’ চালু করা যেতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা চাকরি, ব্যবসা বা অন্যান্য পেশার কারণে নিজ এলাকার বাইরে অবস্থান করেন, তাঁদের যাতায়াত ও সময়ের চাপ কমাতে এটি সহায়ক হবে। অনেকটা বাংলা নতুন বছরের উৎসব ভাতার মত।

ভোটবান্ধব সরকারি ছুটি: নির্বাচনের আগে ও পরে পর্যাপ্ত সরকারি ছুটি বহাল রাখা, যাতে মানুষ নির্বিঘ্নে নিজ এলাকায় গিয়ে ভোট দিতে পারেবাংলা নববর্ষের ছুটির মতো একটি জাতীয় অনুভূতি তৈরি হবে।

নির্বাচনকে জাতীয় উৎসবে রূপ দেওয়া: নির্বাচনকে শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়, বরং নাগরিক দায়িত্ব ও গণতান্ত্রিক উৎসব হিসেবে উপস্থাপন করা।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রণোদনা: বোনাস ও ছুটির মাধ্যমে ভোটদানে ইতিবাচক প্রণোদনা তৈরি হলে ভোটার উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।

বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি: নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদার ভূমিকা ও সবার জন্য সমান সুযোগ।

সহিংসতামুক্ত প্রচারণা: শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, অপপ্রচার ও ভয়ভীতি রোধ।

ভোটার সচেতনতা: ভোটের গুরুত্ব, পদ্ধতি ও সময়সূচি নিয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম।

সব দলের অংশগ্রহণ: নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের সমান প্রচার সুযোগ নিশ্চিত করা।

তরুণ ও নারীদের সম্পৃক্ততা: বিশেষ উদ্যোগ, সহজ ভোটার নিবন্ধন ও ভোটকেন্দ্রে সহায়ক ব্যবস্থা।

স্বচ্ছ ভোটগ্রহণ: আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যবেক্ষক ও দ্রুত ফল প্রকাশ।

প্রবাসী ভোটের ব্যবস্থা: প্রবাসীদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নে কার্যকর পদ্ধতি।

রাজনৈতিক দলের প্রচারণা: রাজনৈতিক দলগুলো কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য, বিশেষ প্রচারণা ও ব্যবস্থা করা।

প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ জনগোষ্ঠীর মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগে বিশেষ ব্যবস্থা: জাতীয় নির্বাচনে প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ জনগোষ্ঠীর মানুষের ভোটাধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা এবং প্রান্তিক অঞ্চলের জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য। এ জন্য প্রবীণ ও শারীরিকভাবে অক্ষম ভোটারদের জন্য সহজ প্রবেশযোগ্য ভোটকেন্দ্র, র‍্যাম্প, হুইলচেয়ার সুবিধা, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভোট প্রদানের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তাকারী ব্যক্তির সহায়তা নিশ্চিত করা যেতে পারে। বিশেষ জনগোষ্ঠী, যেমন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগণের জন্য মাতৃভাষায় নির্দেশনা, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড়ি, চর, হাওর ও দুর্গম প্রান্তিক অঞ্চলের জন্য ভ্রাম্যমাণ ভোটকেন্দ্র, বাড়তি ভোটগ্রহণ সময়, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে এসব এলাকার জনগণ নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত হবে। এ ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা জাতীয় নির্বাচনকে আরও ন্যায্য, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল করে তুলবে।


এই ধরনের উদ্যোগ নির্বাচনকে আরও অংশগ্রহণমূলক, আনন্দমুখর ও জনগণকেন্দ্রিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।